কলাম

মতামত

আতঙ্ক থেকেই কি মোদি তেলাপোকা মারতে কামান দাগাচ্ছেন?

লেখা:
বিদ্যা কৃষ্ণন
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ২০: ২৩
বিজেপি সরকার তরুণদের অসন্তোষকে বোঝার চেষ্টা না করে বরং তাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ মনে করছে
বিজেপি সরকার তরুণদের অসন্তোষকে বোঝার চেষ্টা না করে বরং তাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ মনে করছে
সংগৃহীত

ভারতে সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ এক অদ্ভুত চিত্র সামনে এনেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের গভীর অনিরাপত্তা যেন প্রকাশ্যে এসে পড়েছে। কয়েকজন কলেজপড়ুয়া তরুণ-তরুণী মিলে তৈরি করেছিলেন একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন অ্যাকাউন্ট—‘ককরোচ জনতা পার্টি’।

নিছক মজা, সামান্য বিদ্রূপ নিয়ে এর শুরু। কিন্তু সেই ছোট্ট উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরে এসে এমন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিল, যা দেখে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ কি অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া নয়?

এই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র জন্মের পেছনেও রয়েছে এক বিতর্কিত মন্তব্য। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার যুবসমাজ, যারা সাংবাদিকতা বা সামাজিক আন্দোলনের দিকে ঝুঁকছে, তাঁদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

এই মন্তব্য থেকেই ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে তৈরি হয় এই সংগঠন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি সামাজিক মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।

ইনস্টাগ্রাম ও এক্স—এই দুই প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ মানুষ সেটিকে অনুসরণ করতে শুরু করেন।

গরমে ধুঁকছে ভারত, মৃত্যুর মিছিলেও নিস্পৃহ মোদি
গরমে ধুঁকছে ভারত, মৃত্যুর মিছিলেও নিস্পৃহ মোদি

ব্যঙ্গের এই সহজাত শক্তিই সম্ভবত এটিকে আরও বড় করে তোলে। বিবিসি, সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান, ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর—এই সব আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ফলে বিষয়টি আর নিছক অনলাইন মজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে। আর সেখানেই যেন চমকে ওঠে ভারতের প্রবীণ শাসকগোষ্ঠী।

বিজেপি সরকার এই অসন্তোষকে বোঝার চেষ্টা না করে বরং তাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ এবং ‘ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত করতে শুরু করে। এর পরিণতিও দ্রুত দেখা যায়।

ভারতের ভেতর থেকে ওই পেজটি আর দেখা যায় না। শুধু তাই নয়, একাধিক প্ল্যাটফর্মে চাপ সৃষ্টি করে অ্যাকাউন্টটিকে মুছে ফেলার চেষ্টা চালানো হয়। ওয়েবসাইট নামিয়ে দেওয়া হয়।

মন্ত্রীরা ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতাকে ‘বিদেশি প্রভাবিত’ বলে অভিযোগ তোলেন। এমনকি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদনও করা হয়।

একটি ব্যঙ্গাত্মক অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে এমন আক্রমণ যেন তেলাপোকা মারতে কামান দাগারই শামিল।

ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সদস্যরা এখন রাস্তায় নেমে এসেছেন।
ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সদস্যরা এখন রাস্তায় নেমে এসেছেন।
ছবি: এএফপি

এই ঘটনাটি কেবল একটি অনলাইন কৌতুকের প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ভারতের যুবসমাজের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তারা এমন এক চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, যেখানে কাজের সুযোগ সীমিত।

তাঁরা চরম প্রতিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, শ্বাসরুদ্ধকর দূষণের মধ্যে তাঁরা বিক্ষোভ করছেন। তার ওপর আবার তাদেরই সরকারের দিক থেকে ত্যাগ স্বীকারের উপদেশ দেওয়া হচ্ছে বারবার।

শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থাও উদ্বেগজনক। গত মাসেই স্নাতক পর্যায়ের চিকিৎসাশিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা সামনে আসে।

এর পাশাপাশি স্কুলের পরীক্ষায় নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রেও কেলেঙ্কারি ধরা পড়ে। যারা এই বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দূরদর্শন তাদের ‘পাকিস্তানি’ বলে আখ্যা দেয়। এটি এমন এক ভয়াবহ বাস্তবতা, যেখানে নিজেদের সন্তানদেরই দেশদ্রোহী বলে চিহ্নিত করছে রাষ্ট্র।

এই পরীক্ষাজনিত কেলেঙ্কারির জেরে একাধিক শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু তাতেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তরফে সহানুভূতির কোনো প্রকাশ দেখা যায়নি।
এই উদাসীনতা অন্য ক্ষেত্রেও স্পষ্ট।

‘তেলাপোকা’র প্রতিরোধ ভারতে কেন এত আলোড়ন তুলল
‘তেলাপোকা’র প্রতিরোধ ভারতে কেন এত  আলোড়ন তুলল

মোদির নেতৃত্বের একটি বৈশিষ্ট্য যেন এমন—ভারতের সীমানা থেকে যত দূরে কোনো মানবিক বিপর্যয় ঘটে, তার প্রতি তাঁর সহানুভূতি তত বেশি। তেলেঙ্গানায় এক দিনে ৬৭ জন তাপপ্রবাহে মারা গেলেও তিনি সে বিষয়ে মুখ খোলেননি, অথচ চিনের শানসি প্রদেশে খনি দুর্ঘটনায় মৃতদের জন্য তিনি শোকপ্রকাশ করেছেন।

মোদির শাসন যেন এক কঠোর প্রভুর মতো, যেখানে প্রতিটি নির্দেশই এক একটি আনুগত্যের পরীক্ষা।

মোদি জনগণকে বাড়ি থেকে কাজ করতে, অযথা জ্বালানি ব্যবহার না করতে, বিদেশ ভ্রমণ কমাতে, রান্নার তেল কম খরচ করতে, সোনা না কিনতে, বেশি কাজ করতে, কম খরচ করতে এবং ধৈর্য ধরতে বলেছেন।

অথচ এই নির্দেশ দেওয়ার পরপরই তিনি নিজে ইউরোপ সফরে বেরিয়ে পড়েন। এটি তাঁর উপদেশগুলোর সঙ্গে এক স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করে।

এই সফরেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। নরওয়েতে হেলে লিয়ং স্ভেনসেন নামের এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, কেন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রশ্নের উত্তর দেন না।

মোদি সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যান, তাঁর সঙ্গে চোখাচোখি না করে কোনো উত্তর না দিয়েই সরে যান। ভারতে বসে এই দৃশ্য অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।

বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে নরওয়ে যেখানে এক নম্বরে, ভারত সেখানে ১৫৭ নম্বরে। এই বৈপরীত্যই অনেক কিছু বলে দেয়।

নরওয়েতে হেলে লিয়ং স্ভেনসেন নামের এক সাংবাদিক মোদিকে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রশ্নের উত্তর দেন না। মোদি সেই প্রশ্ন এড়িয়ে কোনো উত্তর না দিয়েই সরে যান।
নরওয়েতে হেলে লিয়ং স্ভেনসেন নামের এক সাংবাদিক মোদিকে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি বিশ্বের সবচেয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রশ্নের উত্তর দেন না। মোদি সেই প্রশ্ন এড়িয়ে কোনো উত্তর না দিয়েই সরে যান।
ছবি: সংগৃহীত

এই ঘটনার পর ওসলোতে ভারতীয় দূতাবাস এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে কূটনীতিক সিবি জর্জ প্রায় ১৩ মিনিট ধরে নানা প্রচলিত বক্তব্য তুলে ধরেন। সেখানে ১৪০ কোটি মানুষ, ৫ হাজার বছরের সভ্যতা, যোগ, গান্ধী—এই শব্দগুলো বারবার উচ্চারিত হয়, কিন্তু তাঁর প্রশ্নের সরাসরি উত্তর মেলে না।

সাংবাদিক স্ভেনসেনের জন্যও অভিজ্ঞতাটি সহজ ছিল না। তাঁকে বিদেশি গুপ্তচর বলা হয়, তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করা হয়, এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে ইনস্টাগ্রাম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

স্বাধীন চিন্তা—তা সে ককরোচ জনতা পার্টির মতো ব্যঙ্গাত্মক হোক, কিংবা নরওয়ের সাংবাদিকের প্রশ্ন—এই দুই ক্ষেত্রেই মোদী প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া যেন একরকম। দুই ক্ষেত্রেই মোদির প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক, আবেগপ্রবণ এবং আক্রমণাত্মক।

একটি সরকার যদি সাধারণ প্রশ্ন বা কৌতুকেই এতটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে, তাহলে তা প্রশ্নকর্তার চেয়ে সরকারের চরিত্রই বেশি প্রকাশ করে। বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিন ধরে যে প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে এক শক্তিশালী ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।

এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি দিক আশাব্যঞ্জক। তা হলো—মোদির সাফল্যের মোহ ভেঙে যাচ্ছে। নানা বাধা সত্ত্বেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এবং অন্যান্য প্রতিবাদ টিকে আছে। হয়তো এই মেয়াদই তাঁর শেষ প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কাল। আর এক দিন (হয়তো খুব শিগগিরই) এই সরকারের পতন ঘটবে। আর বেঁচে থাকবে সেই ‘তেলাপোকা’রা, যাদের এত দিন তুচ্ছ করা হয়েছিল।

যুদ্ধ, মূল্যবৃদ্ধি, ভিসা নীতির কড়াকড়ি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাপ—এই সবই মোদির প্রশাসনিক দুর্বলতাকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে। ফলে তাঁর সহনশীলতা কমছে, প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হচ্ছে।

নোটবন্দি, কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যর্থতা—গত কয়েক বছর ধরে একের পর এক এসব নীতিগত ব্যর্থতা দেশের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।

এর পাশাপাশি সেতু ভেঙে পড়া, পানির সংকট, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস—এসব প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যা যুবসমাজকে আরও হতাশ করে তুলছে।

একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন ন্যূনতম অর্থনৈতিক স্থিতি, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ এবং নেতৃত্বের ওপর আস্থা। কিন্তু আজ ভারতের বাস্তবতা হলো—অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর কথায় আস্থা রাখতে পারছেন না।

বিরোধী দল, সাংবাদিক ও অধিকার কর্মীরা সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে ভারতকে এখন ‘নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় জনতা পার্টি যেন কেবল নির্বাচন জেতার যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে শাসনের দক্ষতা বা রাজনৈতিক সংলাপের জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ—এই সবই গণতন্ত্রে চাপ কমানোর একটি স্বাভাবিক মাধ্যম। কিন্তু তা দমন করলে অসন্তোষ কমে না, বরং আরও তীব্র হয়। দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশে তরুণদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকার পতনের নজির রয়েছে—যার শুরু হয়েছিল এমনই সাধারণ প্রতিবাদ দিয়ে।

এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি দিক আশাব্যঞ্জক। তা হলো—মোদির সাফল্যের মোহ ভেঙে যাচ্ছে। নানা বাধা সত্ত্বেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এবং অন্যান্য প্রতিবাদ টিকে আছে। হয়তো এই মেয়াদই তাঁর শেষ প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়কাল।

আর এক দিন (হয়তো খুব শিগগিরই) এই সরকারের পতন ঘটবে। আর বেঁচে থাকবে সেই ‘তেলাপোকা’রা, যাদের এত দিন তুচ্ছ করা হয়েছিল।

বিদ্যা কৃষ্ণন একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তিনি মূলত সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ক লেখালেখি করেন।
আল জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ