বিয়ের জাঁকজমক ও যৌতুকের নতুন রূপ
ভারতে বিয়ের বাজার বর্তমানে প্রায় ১০ থেকে ১৩ লাখ কোটি টাকার এক বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরের বিয়ের মৌসুমে রাজকীয় ভেন্যু, ডিজাইনার পোশাক ও আলোকসজ্জার আড়ালে লুকিয়ে থাকছে এক প্রাচীন ব্যাধি—যৌতুক। আধুনিক সমাজে সরাসরি যৌতুক চাওয়ার পরিবর্তে একে এখন ‘উপহার’, ‘সম্মানসূচক নজরানা’ বা ‘মিলনি’র মতো গালভরা নামে আড়াল করা হচ্ছে। সমাজকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি মূলত একটি আদিম প্রথার আধুনিক ও কুৎসিত রূপান্তর মাত্র।
অর্থনৈতিক বোঝা ও সামাজিক সমীকরণ
সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে একটি বিয়ের খরচ মেটাতে গড়ে ১৫ থেকে ১৬ লাখ রুপি পর্যন্ত ঋণের বোঝা টানতে হয়। এই খরচের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় বরপক্ষকে দেওয়া সোনাদানা, দামি গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী এবং নগদ টাকার পেছনে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বরের পেশাগত যোগ্যতা বা ডিগ্রি অনুযায়ী তার একটি অলিখিত ‘রেট কার্ড’ তৈরি হয়। অন্যদিকে, কনের ক্ষেত্রে তথাকথিত সামাজিক মানদণ্ড বজায় রাখতে কনেপক্ষকে চড়া মূল্য দিতে বাধ্য করা হয়। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এখন এই ‘উপহারের প্রদর্শনী’ আভিজাত্য জাহির করার মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যৌতুকের বলি ও আইনি সীমাবদ্ধতা
যৌতুকের এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অসংখ্য নারী। ২০২৪ সালে ভারতে যৌতুক সংক্রান্ত সহিংসতার কারণে ৫ হাজার ৭৩৭ জন নারী প্রাণ হারিয়েছেন, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ১৬ জন। সম্প্রতি ভোপালের তিষা শর্মার রহস্যজনক মৃত্যু এই ভয়াবহতাকে পুনরায় সামনে এনেছে; ময়নাতদন্তে তার মাথায় আঘাত ও রক্তক্ষরণের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের ইঙ্গিত দেয়। ১৯৬১ সালে ভারতে যৌতুক নিষিদ্ধ হলেও আইনের ফাঁকফোকর ও প্রমাণের অভাবে অপরাধীদের শাস্তির হার মাত্র ৩৩ শতাংশ। আইনজীবীদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে যৌতুক আইনের চেয়ে গার্হস্থ্য সহিংসতা প্রতিরোধ আইন প্রয়োগ করা বেশি কার্যকর, কারণ সেখানে নির্যাতনের প্রমাণ দাখিল করা সহজ।
মানসিকতার পরিবর্তনই একমাত্র সমাধান
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা বা আধুনিকতা এই প্রথা নির্মূলে ব্যর্থ হচ্ছে কারণ সমাজ এখনো নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী সত্তার চেয়ে ‘পণ্য’ হিসেবে বেশি বিবেচনা করে। যতক্ষণ না সমাজ একজন নারীর জীবনের চেয়ে বাপের বাড়ির দেওয়া উপহারের মূল্যকে কম গুরুত্ব দেবে এবং কনেপক্ষ যৌতুকের দাবি প্রত্যাখ্যান করার সাহস দেখাবে, ততক্ষণ এই নীরব হত্যাযজ্ঞ ও দাসত্ব চলতেই থাকবে।