দিল্লি সফরের পথে প্রধান বাধা শেখ হাসিনার কার্যক্রম
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভারতে অবস্থানরত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের নেতাদের কর্মকাণ্ডকে চিহ্নিত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ঢাকায় আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর ফাঁকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, শেখ হাসিনা ও তাঁর সহযোগীরা দিল্লিতে বসে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন, যা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পথে বড় বাধা। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই কর্মকাণ্ড ভারতের জন্যও কোনো সুফল বয়ে আনছে না এবং এ ধরনের তৎপরতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও প্রত্যাশা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর একটি দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং এটি অনুকূল সময়ে অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী কখনো ভারত সফর করবেন না এমনটি বলেননি। তবে সফরের আগে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ সব বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত, তবে এর বিনিময়ে ভারতের কাছ থেকেও ‘পারস্পরিক সহযোগিতা’ প্রত্যাশা করে ঢাকা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ যেমন ঢাকায় বসে কাউকে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করতে দেবে না, ভারত থেকেও একই ধরনের পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দিল্লি তাঁর মতামতকে গুরুত্ব দেবে।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও জাতীয় স্বার্থ
প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy)-এর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, প্রতিটি স্বাধীন দেশের মতো বাংলাদেশও নিজের জাতীয় স্বার্থ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে চায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় দুই হাজার মানুষের প্রাণহানির প্রসঙ্গ টেনে তিনি শেখ হাসিনাকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং অতীতের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের একটি ‘পরিষ্কার বিচ্ছেদ’ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, দুই সরকার যখন জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে আলোচনায় বসে, তখন সব অমীমাংসিত বিষয় সমাধান করা সম্ভব।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
এদিকে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, এটি মূলত একটি ‘আইনি বিষয়’ এবং এর সঙ্গে আইনি নানা দিক জড়িত। তিনি আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে একটি দূরদর্শী, গঠনমূলক ও ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, যার কেন্দ্রে থাকবে দুই দেশের জনগণের স্বার্থ।
ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, তিস্তা ইস্যু, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা এবং ১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরকে সফল করতে সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি ও প্রস্তুতিনির্ভর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্গঠনে পারস্পরিক সার্বভৌম সম্মান ও জাতীয় স্বার্থই মূল মাপকাঠি হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।