জাতীয়

সব মেডিকেল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু হবে: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী

‎নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা‎
১০ জুন ২০২৬, ২০: ২৮
সব মেডিকেল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু হবে: মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের সমন্বিত সহায়তা দিতে দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।

আজ বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ অনুযায়ী জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার প্রথমে আটটি পুরোনো মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চালু হয়েছিল। পরে আরও ছয়টি নতুন মেডিকেল কলেজে চালু করা হয়। বর্তমানে ১৫টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার রয়েছে।

আবু জাফর বলেন, এসব সেন্টারে চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, ডিএনএ ও ফরেনসিক সহায়তা, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনর্বাসনের সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মন্ত্রী জানান, প্রতিটি সেন্টারে ২২ জন করে জনবল থাকার কথা। এর মধ্যে চারজন চিকিৎসক, ছয়জন নার্স, চারজন পুলিশ কর্মকর্তা, একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, একজন আইন কর্মকর্তা, একজন কম্পিউটার অপারেটর এবং আরও সহায়ক জনবল থাকার কথা।

মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৮১ হাজার ৯২৮ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৪৯ হাজার ৭৬৭ জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৩১ হাজার ৫৯৬ জন এবং অগ্নিদগ্ধ ৫৬৫ জন সেবা পেয়েছেন।

বর্তমানে দেশে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। এসব মেডিকেল কলেজে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী আবু জাফর। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে সেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করা এবং যে চাহিদা রয়েছে, সেই চাহিদাকে অ্যাড্রেস করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ৯৫টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি জেলা সদরে এবং ৬৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চালু আছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলা এবং দেশের প্রত্যেক উপজেলায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল বা সেন্টার চালু করা।

মন্ত্রী জানান, আগে এই কার্যক্রম ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল নামে ছিল, পরে ‘মাল্টি-সেক্টরাল অ্যাপ্রোচ’ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। এখন নতুনভাবে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ বা কিউআরটি কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে, যাতে ঘটনা ঘটার পর দ্রুত ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায় এবং সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনা যায়।

এর আগে নোটিশে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য সদস্য নিপুন রায় চৌধুরী নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা, ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক পরামর্শ, আশ্রয় ও পুনর্বাসন সহায়তা নিয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপিএর ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এর তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘একজন নারী যদি ঘরেও নিরাপদ না হন, একটি কন্যাশিশু যদি পরিচিত পরিবেশেও নিরাপদ না থাকে, তবে আমরা তাকে স্বাধীনভাবে বাঁচার কোন সাহস দেব?’

সম্পূরক প্রশ্নে নিপুন রায় বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯ সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম। জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ নারী ১০৯ হেল্পলাইনের কথা জানেন এবং অনেক নারী কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, সেটিও জানেন না। এই সচেতনতার ঘাটতি দূর করতে মন্ত্রণালয় কী পদক্ষেপ নেবে এবং মাঠ পর্যায়ে ১০৯ ও ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিতে সময় সীমাভিত্তিক কোনো পরিকল্পনা আছে কি না।

জবাবে মন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বা গণ-আন্দোলন তৈরি করতে সরকার কাজ করছে। তিনি বলেন, শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। সরকারি দল, বিরোধী দল, সংসদের বাইরের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষকসহ সবাইকে নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।

মহিলা বিষয়ক মন্ত্রী জানান, কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যন্ত কিশোর-কিশোরী ক্লাবের অংশগ্রহণে সচেতনতা কার্যক্রম নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

১০৯ হেল্পলাইনের কর্মীদের বেতন না পাওয়ার কথাও সংসদে তুলে ধরেন মন্ত্রী আবু জাফর। তিনি বলেন, ‘কল সেন্টারের নম্বর হচ্ছে ১০৯। ১০৯-এ সবাই কাজ করছে, কিন্তু তারা বছরের পর বছর বেতন পাচ্ছে না। আমরা এবার উদ্যোগ নিয়েছি, থোক বরাদ্দ দিয়ে তাদের বেতন চালু করার জন্য।’

মন্ত্রী বলেন, সরকার একদিকে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেলের কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে, অন্যদিকে জনগণের অংশগ্রহণে সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের প্রতিকার পাওয়ার পথ সম্পর্কে জানাতে কাজ করছে।