অদৃশ্য বিষাক্ত চক্রে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য: দেশে বৈদ্যুতিক অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লেড-এসিড ব্যাটারির ব্যবহার, যা বর্তমানে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ অদৃশ্য চক্র তৈরি করেছে। অটোরিকশার অকেজো ব্যাটারিগুলো গ্যারেজ ও ভাঙাড়ি ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে অবৈধ সিসা গলন কারখানায় পৌঁছাচ্ছে। সেখানে খোলা জায়গায় বা মাটির গর্তে আগুন দিয়ে ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা আলাদা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নির্গত বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করছে এবং এসিড ও সিসার বর্জ্য মাটি ও পানিতে মিশে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। এভাবে সংগৃহীত সিসা পুনরায় নতুন ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে বাজারে ফিরে আসছে, যা এই বিষাক্ত চক্রকে আরও দীর্ঘায়িত করছে।
পরিসংখ্যান ও ভয়াবহতা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ও অটোরিকশা চলাচল করছে। প্রতিটি যানে অন্তত চারটি লেড-এসিড ব্যাটারি থাকে, যা গড়ে ৭ থেকে ১০ মাস স্থায়ী হয়। ফলে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ বাতিল ব্যাটারি থেকে বিপুল পরিমাণ সিসা বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। জাতিসংঘের ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ই-রিকশা থেকে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার টন সিসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার ৭০ শতাংশই অরক্ষিত উপায়ে রিসাইকেল করা হয়। এছাড়া জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে অন্তত ১ হাজার ১০০টি সিসা কারখানা শনাক্ত করা হয়েছে, যার অধিকাংশই ঢাকা ও এর আশপাশে অবস্থিত।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শিশুদের ওপর প্রভাব: সিসা দূষণের ফলে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও চোখের সমস্যার মতো শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা এই দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বাংলাদেশে কোটি কোটি শিশু উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে রয়েছে, যা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত করছে এবং মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করছে। কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর ও যাত্রাবাড়ীর মতো এলাকাগুলোতে ব্যাটারি গলন কারখানার আশপাশের বাসিন্দারা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কিছু কারখানা বন্ধ করা হলেও, ওইসব এলাকার মাটিতে এখনো সিসার বিষাক্ত অস্তিত্ব রয়ে গেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের উদ্বেগ: পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর আহমেদ কারুজ্জামান মজুমদার সতর্ক করে বলেছেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ রিসাইকেল প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ না করলে বড় ধরনের বিপর্যয় অনিবার্য। এদিকে, ইয়ুথনেট গ্লোবাল ও পিউর আর্থ বাংলাদেশের মতো সংস্থাগুলো এই সংকটকে 'জাতীয় জরুরি অবস্থা' হিসেবে অভিহিত করেছে। ইয়ুথনেট গ্লোবাল-এর নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, সিসা বিষক্রিয়া নীরবে শিশুদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিচ্ছে। তিনি জনস্বাস্থ্য ও জীবিকা সুরক্ষায় একটি ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। অসাধু চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত এই অবৈধ রিসাইকেল প্রক্রিয়া বন্ধে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।